দ্বিতীয় পর্ব
জুলাই গণহত্যার আসামি হয়েও ইবিএলের চেয়ারম্যান পদে শওকত আলী!
ব্যাংকিং সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন
ক্রাইমবিডি ৩৬০ প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০২:২৫ এএম
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে মাদরাসা শিক্ষক হত্যা মামলার আসামি হয়েও রহস্যজনক কারণে এখনো গ্রেপ্তার হননি ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) চেয়ারম্যান ও জাহাজ ভাঙা ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরী। মামলা দায়েরের পর দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং ব্যাংক ও ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আদালত বা থানা থেকে কোনো জামিন না নেওয়া সত্ত্বেও একজন হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামি কীভাবে দেশের একটি স্বনামধন্য ব্যাংকের উচ্চপদে বহাল থাকতে পারেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শেখ হাসিনার সঙ্গে একই মামলার আসামি
আদালত ও বাড্ডা থানা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বাড্ডা লিংক রোডে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গুলিবর্ষণে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন মাদরাসা শিক্ষক হাফেজ মো. মাসুদুর রহমান। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর বাড্ডা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নং-০৫, ধারা ৩০২/৩৪ দণ্ডবিধি)।
মামলার এজাহারে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। আর ৫৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে শওকত আলী চৌধুরীকে (৫৬)। মামলার নথিতে তাঁকে ‘আওয়ামী লীগ নেতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্দোলনের সময় আসামিদের প্রত্যক্ষ হুকুম ও অংশগ্রহণে এই গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
আইনজীবীদের মতে, ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা (হত্যা মামলা) একটি অজামিনযোগ্য অপরাধ। এই ধরনের মামলার আসামির প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর কোনো আইনি সুযোগ নেই।
আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে তাঁর এভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো ও ব্যাংকের শীর্ষ পদে বহাল থাকা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খোদ আইনজীবীরাই। অভিযোগ উঠেছে, মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) থেকে নিজের নাম বাদ দেওয়ার জন্য তিনি বিপুল অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটাচ্ছেন। এর ফলে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের ক্ষোভ ও হতাশা
মামলা দায়েরের এতদিন পরও আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার। মামলার বাদী শাকিল (৪৬) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এমন একটা হত্যা মামলার আসামি হওয়ার পরও শওকত আলী চৌধুরী গ্রেপ্তার না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এই আসামি রীতিমতো প্রকাশ্যেই ব্যবসা পরিচালনা করছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। মূলত রহস্যজনক কারণেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। আমরা চরম হতাশায় ভুগছি।’
নিহত মাদরাসা শিক্ষকের স্ত্রী তাছমিন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি শুধু আমার স্বামী মাসুদুর রহমান হত্যার বিচার চাই। খুনিরা কেন এখনো জেলের বাইরে থাকবে?’
টাকা ও ক্ষমতার জোরেই কি পার?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে এর আগেই ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন, হুন্ডি ও জাহাজ ভাঙার ব্যবসার আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের দ্বৈত নাগরিকত্ব। দেশের আর্থিক খাতকে ঝুঁকিতে ফেলা এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের আসামি হওয়ার পরও দৃশ্যত তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একজন হত্যা মামলার ফেরারি আসামিকে ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে বহাল রাখা ব্যাংকিং সুশাসনের পরিপন্থী। অবিলম্বে তাঁকে আইনের আওতায় না আনলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও জেঁকে বসবে।
(ইবিএলের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর বেনামি সাম্রাজ্য, শেয়ার কেলেঙ্কারি এবং ক্ষমতার নেপথ্য সমীকরণ নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরের পর্ব)
মন্তব্য করুন