×
Logo

জাতীয় অপরাধ

প্রথম পর্ব: ইস্টার্ন ব্যাংকে নজিরবিহীন অনিয়ম

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তের মুখেই শেয়ার বিক্রি

ব্যাংকিং আইন লঙ্ঘন করে ২১ শতাংশের বেশি শেয়ার বেনামে নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ

ক্রাইমবিডি ৩৬০ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:১০ পিএম

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তের মুখেই শেয়ার বিক্রি

ব্যাংকিং আইন লঙ্ঘন করে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) ২১ শতাংশের বেশি শেয়ার বেনামে নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে। তবে ভয়াবহ এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করার পর তড়িঘড়ি করে সেই অবৈধ শেয়ার ছাড়তে শুরু করেছেন তিনি। এরই মধ্যে ব্যাংকটির মালিকানা কাঠামোতে দেখা দিয়েছে নতুন বাঁক। শওকত আলীর বেনামি প্রতিষ্ঠানের ছেড়ে দেওয়া শেয়ার অস্বাভাবিক হারে কিনছে বর্তমান সরকারের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর পরিবার ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।

খাত সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলছেন, এটি কি নিছকই কাকতালীয়, নাকি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের কোনো গভীর যোগসাজশ? প্রাপ্ত নথিপত্র ও অনুসন্ধানে ইবিএলের শীর্ষ পর্যায়ে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার পালাবদলের এক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে।

তদন্তের চাপে বিক্রি হচ্ছে বেনামি শেয়ার

ব্যাংকিং কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ১৪ক ও ১৪খ ধারা অনুযায়ী, কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবার একটি ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না। কিন্তু শওকত আলী চৌধুরী স্ত্রী, সন্তান, শ্যালিকা এবং বিভিন্ন ছদ্মবেশী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইবিএলের ২১.১০ শতাংশ শেয়ার এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এই বেনামি শেয়ারের বিষয়ে তদন্ত শুরু করলে চাপে পড়েন শওকত আলী। বাধ্য হয়ে তিনি শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেন। প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে:

আনিকা সিকিউরিটিজ শূন্য: শওকত আলীর শ্যালিকা আনিকা তাহজীবের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান 'আনিকা শেয়ারস সিকিউরিটিজ লিমিটেড'-এর হাতে থাকা ব্যাংকের পুরো শেয়ার ইতোমধ্যে বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

আরুছা এন্ড কোং-এর শেয়ার হ্রাস: শওকত আলী চৌধুরীর সবচেয়ে বড় প্রক্সি বা ডামি প্রতিষ্ঠান 'আরুছা এন্ড কোং (প্রাঃ) লিমিটেড'-এর ২.৫২ শতাংশ শেয়ার সম্প্রতি বিক্রি করা হয়েছে। তবে এখনো এই ডামি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকের ৬.৯৩ শতাংশ শেয়ার রয়ে গেছে।

ডামি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে আর্থিক সুবিধা

যে 'আরুছা এন্ড কোং (প্রাঃ) লিমিটেড'-এর শেয়ার এখন তড়িঘড়ি করে বিক্রি করা হচ্ছে, সেটি মূলত শওকত আলী চৌধুরীর একটি সাজানো প্রতিষ্ঠান। ২০০১ সালে মাত্র ১ লক্ষ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে নিবন্ধিত এই কোম্পানিটি ওই বছরই ৬ কোটি ৭১ লক্ষ টাকার শেয়ার কেনে। অথচ কোম্পানির ৯৫ শতাংশ শেয়ারহোল্ডার হিসেবে প্রদর্শিত নোইমুল হকের সর্বশেষ আয়কর নথিতে (২০২৫-২৬) তাঁর নিট সম্পদ দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ কোটি টাকা। ফলে ২৪ বছর আগে তাঁর এই বিপুল বিনিয়োগের কোনো আইনি বা আর্থিক ভিত্তি ছিল না বলেই প্রতীয়মান হয়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের মুনাফাও সরাসরি শওকত আলী চৌধুরীর পকেটে গেছে। ২০১৩ সালে জমি বিক্রির ভুয়া কারণ দেখিয়ে শওকত আলী ব্যক্তিগতভাবে কোম্পানিটি থেকে ৯.৯০ কোটি টাকা তুলে নেন। আবার ২০২৪ সালে কোনো বাণিজ্যিক কারণ ছাড়াই বিতর্কিত জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান 'এস.এন কর্পোরেশন'-কে ২৭.২০ কোটি টাকা দেওয়া হয়, যার ৫০ শতাংশ মালিকানা শওকত আলী চৌধুরীর এবং বাকিটা তাঁর স্ত্রীর।

নতুন সমীকরণ: মন্ত্রীর পরিবারের আগ্রাসী ক্রয়

শওকত আলী সিন্ডিকেটের শেয়ার বিক্রির ডামাডোলের মধ্যেই ইবিএলের শেয়ার লেনদেনে আরেকটি অস্বাভাবিক চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর পরিবার ও তাঁর মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অতি দ্রুতগতিতে ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ার কেনা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই মন্ত্রীর পারিবারিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো অস্বাভাবিক হারে শেয়ার কিনে ইতোমধ্যে ব্যাংকটির ৩.২৯ শতাংশ শেয়ার নিজেদের দখলে নিয়েছে। শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিপুল পরিমাণ শেয়ার ক্রয়ের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে (বোর্ড) নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে উক্ত মন্ত্রীর পরিবারের সদস্য ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও রয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তের কারণে শওকত আলী যখন তাঁর ডামি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন, ঠিক সেই সময়েই প্রভাবশালী আরেক পক্ষের এই আগ্রাসী শেয়ার ক্রয় কি শুধুই ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত? নাকি পর্দার আড়ালে শওকত আলীর সাথে নতুন এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কোনো সমঝোতা হয়েছে—তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

(আগামী পর্বে পড়ুন: তথ্য পাচার ও শেয়ারবাজার কারসাজি এবং বিতর্কিত সাবেক প্রতিমন্ত্রীর সাথে ঋণের বিনিময়ে শেয়ার গ্রহণ ও দুদকের তদন্তের বিস্তারিত)

জাতীয় অপরাধ থেকে আরও পড়ুন

বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন

Logo

Shakil Newaz