×
Logo

জাতীয় অপরাধ

ক্ষমতার সমান্তরাল কেন্দ্র

এপিএস ইউনুছ আলীর বিরুদ্ধে পাহাড়সম অভিযোগ, তোলপাড় প্রশাসনে

ক্রাইমবিডি ৩৬০ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০৩ পিএম

এপিএস ইউনুছ আলীর বিরুদ্ধে পাহাড়সম অভিযোগ, তোলপাড় প্রশাসনে

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিবের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) কৃষিবিদ মোঃ ইউনুছ আলীর বিরুদ্ধে। নিয়মবহির্ভূত তদবির, আর্থিক লেনদেন, এবং স্বৈরাচারী আচরণের মাধ্যমে তিনি পুরো মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলেছেন বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, যা বর্তমানে প্রশাসনে তীব্র অস্বস্তি ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

 ১. মন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেতে বাধা: ক্ষুব্ধ রাজনৈতিক ও জনপ্রতিনিধিরা

মন্ত্রণালয়ের মূল চালিকাশক্তিদের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইউনুছ আলী এক বিশাল দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

 ড. খোন্দকার আকবর হোসেন বাবুলের ক্ষোভ: নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, এপিএস ইউনুছ অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চেয়েও বেশি ক্ষমতা দেখান। দলীয় মহাসচিবের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ড. বাবুল পরপর দুই দিন গিয়েও মন্ত্রী ও মহাসচিবের দেখা পাননি, অথচ ইউনুছের পছন্দের কিছু লোক অনায়াসে সাক্ষাৎ পাচ্ছিলেন।

 সংসদ সদস্যদের অসন্তোষ: একাধিক নির্বাচিত সংসদ সদস্য অভিযোগ করেছেন যে, ইউনুছ আলীর অনুমতি ছাড়া মন্ত্রীর কক্ষে ঢোকা অসম্ভব। এর ফলে জনপ্রতিনিধিরা সময়মতো নীতিগত সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

২. অবরুদ্ধ ২৬ সংস্থা: ঝুলে আছে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল

স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনস্থ প্রায় ২৬টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রধান ও প্রকৌশলীরা মন্ত্রীর সাথে দেখা করার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে প্রকল্প অনুমোদন, পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

 মিল্কভিটা, ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন এবং এলজিইডি-র প্রধান প্রকৌশলীরাও নিয়মিত এই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

৩. দুর্নীতির 'রূপকথা': বদলি বাণিজ্য ও কোটি টাকার লেনদেন

ইউনুছ আলীর বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলো রূপকথার গল্পকেও হার মানায়:

 কক্সবাজারের পোস্টিং স্ক্যাম: জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ নাসরুল্লাহকে জোরপূর্বক পদায়ন করার পেছনে প্রায় ২ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

 প্রকৌশলীদের উপর চাপ: জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর সাথে ইউনুছ অত্যন্ত আপত্তিকর আচরণ করেন এবং তাকে নিয়মিত 'টাকা দিয়ে ম্যানেজ' করতে হয় বলে তথ্য মিলেছে। নির্বাহী, তত্ত্বাবধায়ক ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদায়নে মোটা অংকের বাণিজ্য চলছে।

 ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা:* আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে বিগত আওয়ামী আমলের ফ্যাসিস্ট কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসন করার একটি মহাপরিকল্পনা তিনি হাতে নিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

৪. স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মাসোয়ারা ও কমিশন রাজ

মিল্কভিটা ও সমবায়:অভিযোগ রয়েছে যে, মিল্কভিটার বিভিন্ন নিয়োগে ইউনুছ সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন এবং মিল্কভিটার চেয়ারম্যান স্বয়ং তাকে নিয়মিত মাসোয়ারা দিতে বাধ্য হন। এছাড়া কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়নের ফাইল টাকা ছাড়া মন্ত্রীর টেবিলে উপস্থাপন করা হয় না।

 এডিপি (ADP) বরাদ্দ ও টেন্ডার লক:সমবায় অধিদপ্তর ঢাকা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও জেলা পরিষদগুলোর গ্রামীণ অবকাঠামো ও নগর উন্নয়ন তহবিলের এডিপি (ADP) বিশেষ বরাদ্দ ছাড় করার জন্য নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা কমিশন দাবি করা হয়।

 ক্রয় কমিটি (CCGP) নিয়ন্ত্রণ:সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপিত বিভিন্ন টেন্ডারের ফাইল আটকে রেখে নিজের চাহিদা মোতাবেক আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

৫. এলজিইডি-তে বিতর্কিতদের পদায়ন ও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে চাপ

গণমাধ্যম ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের প্রতিবেদনে এলজিইডি-তে ইউনুছ আলীর অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছে:

 বিতর্কিতদের কাঁধে দায়িত্ব: গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে দৈনিক যুগান্তর-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জামালপুর ও ময়মনসিংহে দুর্নীতিগ্রস্ত দুই নির্বাহী প্রকৌশলীকে পদায়নের পেছনে ইউনুছের সক্রিয় ভূমিকার কথা জানানো হয়। একই দিনে অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরও তার ফেসবুক পোস্টে এই অনিয়মের কথা তুলে ধরেন।

ফিরোজ আলমের জন্য তদবির: গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে জুলকারনাইন সায়েরের অপর এক পোস্ট অনুযায়ী—নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনে অভিযুক্ত সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম তালুকদারকে "পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (২য় পর্যায়)" প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (PD) করার জন্য এলজিইডির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন ইউনুছ।

 বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের পুনর্বাসন: গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে দৈনিক খোলা কাগজ-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, আমিরুল ইসলাম, শাহজাহান আলী, মো. ফেরদৌস আহমেদ এবং মোহাম্মদ সাদিকুজ্জামানের মতো 'বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ'-এর সক্রিয় সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পিডি বানানোর জন্য মন্ত্রণালয় থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিল, যার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল ইউনুছ আলীর।

সংযুক্তি ও তথ্যসূত্র:

 1. দৈনিক যুগান্তর প্রতিবেদন (২৮ জুন ২০২৬)

 2. জুলকারনাইন সায়ের-এর ফেসবুক পোস্ট (১৯ মে ও ২৮ জুন ২০২৬)

 3. দৈনিক খোলা কাগজ প্রতিবেদন (২২ জুন ২০২৬)

জাতীয় অপরাধ থেকে আরও পড়ুন

বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন

Logo