×
Logo

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে অপপ্রচার!

হলফনামা ও অনুসন্ধানে মিলল সম্পদের প্রকৃত সত্য

ক্রাইমবিডি ৩৬০ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৭ এএম

হলফনামা ও অনুসন্ধানে মিলল সম্পদের প্রকৃত সত্য

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি-র সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে ওঠা আলোচনা-সমালোচনার মাঝেই তাঁর নির্বাচনী হলফনামা ও পারিবারিক ব্যবসার বর্তমান অবস্থা নিয়ে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, প্রতিমন্ত্রীর নামে ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ সম্পত্তি এবং ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিবরণ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর 'স্বার্থের সংঘাত' (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) এড়াতে তিনি এসব পারিবারিক ব্যবসার মালিকানা থেকে লিখিতভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন। শুধু তাই নয়, জাতীয় নির্বাচনের আগে চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি তাঁদের পারিবারিক মালিকানাধীন ঐতিহ্যবাহী 'রোমা অটোরাইস মিল' ৪২ কোটি টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

১২টি প্রতিষ্ঠানের বিশাল সাম্রাজ্য ও মালিকানা হস্তান্তর

অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মীর পরিবার সুদীর্ঘকাল ধরেই এ অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী ও সম্পদশালী পরিবার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিপুল সম্পদের পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও বড় বাণিজ্যিক খাতের মাধ্যমে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা প্রতিমন্ত্রীর হলফনামা পর্যালোচনায় যে ১২টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো—

১. রোমা অটো রাইস মিল

২. রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেড

৩. রূপসী ফ্লাওয়ার মিল

৪. মীর সীমান্ত-দিগন্ত ফিলিং স্টেশন

৫. মীর লাবনী-সুনাত ফিলিং স্টেশন

৬. মীর দিগন্ত ট্রেডিং এজেন্সি

৭. উত্তর বাংলা ওভারসিজ লিমিটেড

৮. রূপসী কৃষি খামার

৯. রূপসী মৎস্য খামার

১০. রূপসী কংক্রিট ব্রিকস ফ্যাক্টরি

১১. রূপসী মিনি কোল্ড স্টোরেজ

১২. রূপসী প্রাণী খামার

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আইনি ও নৈতিক দিক বিবেচনা করে মীর শাহে আলম পারিবারিক ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি নেন। বর্তমানে যাবতীয় শেয়ার ও পরিচালনাগত দায়িত্ব তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা দেখভাল করছেন।

৪২ কোটির মিল বিক্রি ও জমি নিয়ে বিভ্রান্তির অবসান

ব্যবসায়িক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে 'রোমা অটোরাইস মিল'টি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে ৪২ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়। মিলটির ক্রেতা বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা এলাকার গণেশপুর গ্রামের প্রতিষ্ঠিত রাইস মিল ব্যবসায়ী রবিউল আলম। crimebd360-কে ক্রেতা রবিউল আলম বলেন, "আমি ২ ফেব্রুয়ারি-২০২৬ তারিখে ৪২ কোটি টাকায় মিলটি ক্রয় করেছি এবং মালামালসহ প্রতিষ্ঠানের সব দায়িত্ব বুঝে নিয়েছি।"

এদিকে সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রতিমন্ত্রীর সম্পদ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের সত্যতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই প্রতিবেদনে হলফনামার তথ্য আংশিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেখানে হলফনামায় স্পষ্ট ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ সম্পত্তি ও ১২টি প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ আছে, সেখানে সংবাদে দেখানো হয়েছে মাত্র ৩১ শতাংশ সম্পত্তি। সচেতন মহলের মতে, প্রতিমন্ত্রীর সুনাম ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যেই প্রকৃত তথ্য গোপন করা হয়েছে।

পাশাপাশি প্রতিমন্ত্রীর নামে নতুন করে ২৪২ শতাংশ জমি কেনার যে দাবি করা হয়েছে, তাও সঠিক নয়। আলোচিত এই জমিটি ব্যক্তি মীর শাহে আলমের নামে নয়, বরং কেনা হয়েছে 'রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস লিমিটেড'-এর নামে। আর প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যবসায়িক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

যা বলছেন সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বশীলেরা

প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম স্পষ্ট ভাষায় জানান, "প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছেন। ফলে বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নামে কোনো ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত বা জমি ক্রয়ের প্রশ্নই আসে না। এ নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও অসত‍্য তথ‍্য প্রচার না করার অনুরোধ রইল।"

বিষয়টি নিয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, "মীর শাহে আলম বহু বছর ধরেই এ অঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাঁর বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি ব্যবসার মালিকানা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে আমরা জানি। একটি মহল প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুন্ন করার জন্যই এমন অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছেন বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।"

শিবগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুর রউফ রুবেল প্রকাশিত প্রতিবেদনটির সমালোচনা করে বলেন, "প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে আমার মনে হয়েছে, শিরোনামের সঙ্গে ভেতরের তথ্যের কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। চটকদার নেগেটিভ হেডিং থাকলেও নিউজের সারাংশে পূর্ণাঙ্গ কোনো তথ্য-уপাত্ত উপস্থাপন করা হয়নি।"

crimebd360 অবজারভেশন:

সচেতন মহলের মতে, রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধির হলফনামার পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই না করে আংশিক চিত্র প্রকাশ করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নীতিমালার পরিপন্থী। যেকোনো সংবাদের ক্ষেত্রে গভীর অনুসন্ধান ও সত্যতা নিশ্চিত করাই গণমাধ্যমের মূল কাজ হওয়া উচিত।

মন্তব্য করুন

Logo